১৯৭২ সালের পাহেলা জানুয়ারী একলাশপুর গ্রামে একটি কুঁড়ে ঘরে আমার জন্ম । বাবা মায়ের শেষ সন্তান বলে যে আদর পাওয়ার কথা তা কিন্তু পাইনি। কারন শেষ সন্তান হলে গ্রামে অনেকে সন্তানকে নাতির সাথে তুলনা করে যা আগত সন্তানের জন্য অভিশাপ হিসেবে কাজ করে থাকে। বাবা মা তার সন্তানকে লজজার কারনে ইচ্ছা থাকলেও আদর করতে পারেন না। আমার বেলায় ঠিক এটাই ঘটেছে । তাই আমি কোন দিন সরাসরি আব্বার আদর পাইনি। তাছাড়া তিনি আমার ছোট বেলায় মারা যান । মা আমাকে ও আমার বোন সাজেদাকে নিয়ে এক সংগ্রামে লিপ্ত হন। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালে আমার আব্বা মারা গেলে আমার বড় ভাইয়েরা আলাদা হয়ে পড়ে।
১৯৭৮ সালের জানুয়ারী মাসে আমার বিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু হয়। আপা সেকেনড স্যার এর হাতে দুই টাকা দিলেন আমাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। লেখা পড়া আমার কাছে কখনও কঠিন মনে হয়নি । কিন্তু অসুখ আমার শত্রুতে পরিনত হল। ছোট বেলায় অসুখে অনেক কষ্ট পেয়েছি । মনে পড়লে এখনো খারাপ লাগে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না।মা অনেক চেষ্টা করতেন আমাকে সুস্থ রাখতে। সেটা সব সময় সম্ভব হত না । এখানে মাও কিছুই করতে পারতেন না।১
১৯৮১ সালে ৫ম শ্রেণী শেষ করে ফেললাম । রেজাল্ট - বরাবরের মতো প্রথম। ১৯৮২ সালে জানুয়ারী মাসে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম সরকারি কারি গরি উচ্চ বিদ্যালয়ে । বাড়ি থেকে ৩ মাইল দূরে আমার নতুন বিদ্যালয়। সেজে ভাই আমাকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যেতেন সকালে। এখানে আমার নতুন অনেক বন্ধুর সৃষ্টি হল। তাঁরা আমাকে ডাকত । আমি তাঁদের সঙ্গে মিশে যেতে থাকি। এক সময় মনে হল আমি এখানে খুব পরিচিত।
ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর অনেকে আমাকে গুরুত্ব দিতে থাকলো । এতে আমার পড়া চালিয়ে যেতে অনেক সাহায্য হল। এমন অনেক ফি থাকে যা মাফ করানোর ক্ষেত্রে আমার এ বন্ধুরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে । আমি আজও সে কথা মনে করি। আমি কখনো অকৃতজ্ঞ ছিলাম না। আমিও বন্ধুদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতে চেষ্টা করি।
যে দিন আমি ৮ম শ্রেনীতে উন্নীত হই সে দিন আমি বিদ্যালয়ে হাজির হতে পারিনি। আমি ছোট বেলায় অনেক রোগ ভোগের পর পড়া লেখা শুরু করি। হাজির না হওয়ার কারন ওই একই অসুখ । আমি অধিকার বঞ্ছিত শিশুদের একজন ছিলাম এটা বলতে আমার কোন লাজ নেই। সত্য প্রকাশ করার মাঝে আমার অনেক তৃপ্তি লাগে। চাই সেটা নিজের অক্ষমতা হোক না কেন। তবুও সেটা সত্য।
অষ্টম শ্রেণী তে উঠে অনেক পড়া । টাকা ও দরকার। আপা কিছু টাকা ডিম বিক্রি করে যোগাড় করে দিলেও তা যথাযথ ছিল না। তো বন্ধুরা আগের মতো সাহায্য করেছে । শেষে বিদ্যালয়ে কোচিং হবে ফি ২৫০ টাকা মাত্র । ২০০ টাকা যোগাড় করলাম । ৫০ টাকা স্যার মাপ করলেন। ডিসেম্বর মাসে বৃত্তি পরীক্ষা হল । ওই মাসে বার্ষিক পরীক্ষা ও হল ৯ম শ্রেণী তে উঠলাম । তিন মাস পর জানলাম আমি বৃত্তি পেয়েছি যেন জীবনের একটা উপায় হল। এর পর লজিং এর সাথে টিউশনী করে চলতে লাগলাম ।
আগে লোহার কাজ নিয়ে পড়া শুরু করলাম। পরে উচ্চতর গণিত নিলাম টেকনিক্যাল ড্রইং এর পরিবর্তে । বৃত্তি না পেলে হয়তো উচ্চতর গণিত পড়ার সাহস পেতাম না। এস, এস, সি, পাশ করলাম ১৯৮৭ সালে । ফলাফল মনের মতো হল না। জীবনে প্রথম একটি ধাক্কা খেলাম। এস, এস, সি, পরীক্ষা দিয়ে তারেকের ভাই আরমান কে প্রাইভেট পড়ালাম । সেই টাকা টা এমন সময় পেলাম যাতে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে গেল। সেই থেকে কলেজে পড়া শুরু। তবে কলেজে পড়েছি বটে তা অনেক টা মনের ইচ্ছের বিরুদ্দে। ইচ্ছে ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার । কিন্তু মাস মাস ২০০ টাকা করে খরচ চালানোর মতো কেউ সেই সময় আমার জন্য সাহয্যের হাত বাড়ায় নি । ফলে সেটি আর হলনা । তাতে এখন আমার আর দুঃখ না থাকলেও তখন ছিল। কারন এখন তার থেকে বড় পদে আছি।
তার পর ইন্টার পাস করলাম ১৯৮৯ সালে। সেটিও ভালো হয়নি। বন্ধুরা বিশ্বাস করে না তারা বলে আমি নাকি সত্য কথা বলিনি। কিন্তু পরে তারা আমার কথার সত্যতা খুঁজে ফেল । অন্তত আবার ও বুঝতে পারল আমি মিথ্যা বলিনা। অবশেষে গণিত সহ বি, এস, এস এ ভর্তি হলাম। বাদ দিলাম পদার্থ ও রসায়ন।
রসায়ন বাদ দেবার পেছনে আছে একটি ব্যাপার । আমাদের রসায়ন পড়াতেন মৃত্যুঞ্জয় সরকার বাবু। তিনি ইন্টার এ পড়া অবস্থায় বলতেন তিন বার ফেল না করলে ডিগ্রী পাশ শুদ্ধ হয় না । আমরা যারা একবারে পাস কতে চাইলাম তারা এগার জন আমার মতো করলাম। পাশ একবারেই করেছি ফলাফল যাই হোক না কেন।
পরে ঢাকা কলেজ থেকে আরেকটি ডিগ্রি নিলাম। বি, এড , এর জন্য ভর্তি হলাম ফেনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে। জুলাই মাসের প্রথম দিন ক্লাস শুরু হল।
ফেনী তে এলাম । এখন থাকবো কোথায়? প্রথম দুই দিন আমার এক ক্লাস মেট শাহজালাল এর সঙ্গে ফেনী থাকলাম। তাকে বললাম আমাকে একটি লজিং ঠিক করে দিতে। সে আবু আহমদ ভাই এর সাথে যোগাযোগ করে একটি লজিং ঠিক করে দিল।২
বি , এড , এর পড়া অনেক মজার। পড়াগুলো জানা পরিবেশের; কিন্তু তবুও অজানা আনন্দ আমার মাঝে কাজ করতে থাকে। সাধারণ একাডেমিক পড়ার থেকে এটি অনেক পৃথক । (চলবে)
১৯৭৮ সালের জানুয়ারী মাসে আমার বিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু হয়। আপা সেকেনড স্যার এর হাতে দুই টাকা দিলেন আমাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে। দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। লেখা পড়া আমার কাছে কখনও কঠিন মনে হয়নি । কিন্তু অসুখ আমার শত্রুতে পরিনত হল। ছোট বেলায় অসুখে অনেক কষ্ট পেয়েছি । মনে পড়লে এখনো খারাপ লাগে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না।মা অনেক চেষ্টা করতেন আমাকে সুস্থ রাখতে। সেটা সব সময় সম্ভব হত না । এখানে মাও কিছুই করতে পারতেন না।১
১৯৮১ সালে ৫ম শ্রেণী শেষ করে ফেললাম । রেজাল্ট - বরাবরের মতো প্রথম। ১৯৮২ সালে জানুয়ারী মাসে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম সরকারি কারি গরি উচ্চ বিদ্যালয়ে । বাড়ি থেকে ৩ মাইল দূরে আমার নতুন বিদ্যালয়। সেজে ভাই আমাকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যেতেন সকালে। এখানে আমার নতুন অনেক বন্ধুর সৃষ্টি হল। তাঁরা আমাকে ডাকত । আমি তাঁদের সঙ্গে মিশে যেতে থাকি। এক সময় মনে হল আমি এখানে খুব পরিচিত।
ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর অনেকে আমাকে গুরুত্ব দিতে থাকলো । এতে আমার পড়া চালিয়ে যেতে অনেক সাহায্য হল। এমন অনেক ফি থাকে যা মাফ করানোর ক্ষেত্রে আমার এ বন্ধুরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে । আমি আজও সে কথা মনে করি। আমি কখনো অকৃতজ্ঞ ছিলাম না। আমিও বন্ধুদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করতে চেষ্টা করি।
যে দিন আমি ৮ম শ্রেনীতে উন্নীত হই সে দিন আমি বিদ্যালয়ে হাজির হতে পারিনি। আমি ছোট বেলায় অনেক রোগ ভোগের পর পড়া লেখা শুরু করি। হাজির না হওয়ার কারন ওই একই অসুখ । আমি অধিকার বঞ্ছিত শিশুদের একজন ছিলাম এটা বলতে আমার কোন লাজ নেই। সত্য প্রকাশ করার মাঝে আমার অনেক তৃপ্তি লাগে। চাই সেটা নিজের অক্ষমতা হোক না কেন। তবুও সেটা সত্য।
অষ্টম শ্রেণী তে উঠে অনেক পড়া । টাকা ও দরকার। আপা কিছু টাকা ডিম বিক্রি করে যোগাড় করে দিলেও তা যথাযথ ছিল না। তো বন্ধুরা আগের মতো সাহায্য করেছে । শেষে বিদ্যালয়ে কোচিং হবে ফি ২৫০ টাকা মাত্র । ২০০ টাকা যোগাড় করলাম । ৫০ টাকা স্যার মাপ করলেন। ডিসেম্বর মাসে বৃত্তি পরীক্ষা হল । ওই মাসে বার্ষিক পরীক্ষা ও হল ৯ম শ্রেণী তে উঠলাম । তিন মাস পর জানলাম আমি বৃত্তি পেয়েছি যেন জীবনের একটা উপায় হল। এর পর লজিং এর সাথে টিউশনী করে চলতে লাগলাম ।
আগে লোহার কাজ নিয়ে পড়া শুরু করলাম। পরে উচ্চতর গণিত নিলাম টেকনিক্যাল ড্রইং এর পরিবর্তে । বৃত্তি না পেলে হয়তো উচ্চতর গণিত পড়ার সাহস পেতাম না। এস, এস, সি, পাশ করলাম ১৯৮৭ সালে । ফলাফল মনের মতো হল না। জীবনে প্রথম একটি ধাক্কা খেলাম। এস, এস, সি, পরীক্ষা দিয়ে তারেকের ভাই আরমান কে প্রাইভেট পড়ালাম । সেই টাকা টা এমন সময় পেলাম যাতে কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে গেল। সেই থেকে কলেজে পড়া শুরু। তবে কলেজে পড়েছি বটে তা অনেক টা মনের ইচ্ছের বিরুদ্দে। ইচ্ছে ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার । কিন্তু মাস মাস ২০০ টাকা করে খরচ চালানোর মতো কেউ সেই সময় আমার জন্য সাহয্যের হাত বাড়ায় নি । ফলে সেটি আর হলনা । তাতে এখন আমার আর দুঃখ না থাকলেও তখন ছিল। কারন এখন তার থেকে বড় পদে আছি।
তার পর ইন্টার পাস করলাম ১৯৮৯ সালে। সেটিও ভালো হয়নি। বন্ধুরা বিশ্বাস করে না তারা বলে আমি নাকি সত্য কথা বলিনি। কিন্তু পরে তারা আমার কথার সত্যতা খুঁজে ফেল । অন্তত আবার ও বুঝতে পারল আমি মিথ্যা বলিনা। অবশেষে গণিত সহ বি, এস, এস এ ভর্তি হলাম। বাদ দিলাম পদার্থ ও রসায়ন।
রসায়ন বাদ দেবার পেছনে আছে একটি ব্যাপার । আমাদের রসায়ন পড়াতেন মৃত্যুঞ্জয় সরকার বাবু। তিনি ইন্টার এ পড়া অবস্থায় বলতেন তিন বার ফেল না করলে ডিগ্রী পাশ শুদ্ধ হয় না । আমরা যারা একবারে পাস কতে চাইলাম তারা এগার জন আমার মতো করলাম। পাশ একবারেই করেছি ফলাফল যাই হোক না কেন।
পরে ঢাকা কলেজ থেকে আরেকটি ডিগ্রি নিলাম। বি, এড , এর জন্য ভর্তি হলাম ফেনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে। জুলাই মাসের প্রথম দিন ক্লাস শুরু হল।
ফেনী তে এলাম । এখন থাকবো কোথায়? প্রথম দুই দিন আমার এক ক্লাস মেট শাহজালাল এর সঙ্গে ফেনী থাকলাম। তাকে বললাম আমাকে একটি লজিং ঠিক করে দিতে। সে আবু আহমদ ভাই এর সাথে যোগাযোগ করে একটি লজিং ঠিক করে দিল।২
বি , এড , এর পড়া অনেক মজার। পড়াগুলো জানা পরিবেশের; কিন্তু তবুও অজানা আনন্দ আমার মাঝে কাজ করতে থাকে। সাধারণ একাডেমিক পড়ার থেকে এটি অনেক পৃথক । (চলবে)
No comments:
Post a Comment